বাংলাদেশে জুয়ার সাথে stress disorder

বাংলাদেশে জুয়ার সাথে স্ট্রেস ডিসঅর্ডার

বাংলাদেশে জুয়ার সাথে সম্পর্কিত স্ট্রেস ডিসঅর্ডার একটি উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে আর্থিক ক্ষতি, পারিবারিক কলহ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সম্মিলিত চাপ ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে। ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বাংলাদেশ জুয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে প্রায় ৩৮% ক্লিনিক্যালি স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে ভুগছেন, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। এই স্ট্রেস শুধু অর্থ হারানোর তীব্রতা থেকেই আসে না, বরং লুকিয়ে থাকা অভ্যাস, ঋণের বোঝা এবং ‘আবার খেললে হয়তো হারানো টাকা ফিরে পাব’ এই অসহায় আশার বিষাক্ত চক্র থেকে সৃষ্টি হয়।

এই সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্য ক্ষতির স্কেল দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক জুয়ার লেনদেনের পরিমাণ বছরে প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকার একটি বড় অংশই ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। যখন একজন ব্যক্তি মাসিক আয়ের ৩০% এর বেশি জুয়ায় বিনিয়োগ করতে শুরু করেন, তখন তার মধ্যে Acute Stress Reaction দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ৬৫% বেড়ে যায়। নিচের টেবিলটি বিভিন্ন আয় গোষ্ঠীতে জুয়ায় ব্যয়ের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট স্ট্রেস লেভেলের মধ্যে সম্পর্ক দেখায়:

মাসিক আয় (টাকায়)জুয়ায় গড় মাসিক ব্যয় (%)মাঝারি থেকে তীব্র স্ট্রেসে আক্রান্ত খেলোয়াড়ের %সবচেয়ে সাধারণ স্ট্রেস ট্রিগার
২০,০০০ – ৩০,০০০৪২%৫৮%বেসিক প্রয়োজনীয়তা (খাদ্য, ভাড়া) কাটছাঁট
৩০,০০১ – ৫০,০০০৩৫%৪৭%পারিবারিক দ্বন্দ্ব
৫০,০০১ – ১,০০,০০০২৮%৩১%সামাজিক মর্যাদা হ্রাসের ভয়
১,০০,০০০+১৫%২২%বিনিয়োগের সুযোগ হারানো

স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো কেবল মানসিকই নয়, শারীরিকভাবেও প্রকাশ পায়। কার্ডিওলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য মতে, গত দুই বছরে জুয়ার সাথে জড়িত তরুণ রোগীদের (বয়স ২২-৩৫) মধ্যে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ৭০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার পেছনে তীব্র স্ট্রেস একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই রোগীদের ৮০%ই স্বীকার করেছেন যে বড় অঙ্কের টাকা হারানোর পরপরই তারা বুকে ব্যথা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন এবং শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে শুরু করেন।

অনলাইন জুয়ার প্রসঙ্গে আসলে স্ট্রেসের ধরন আরও জটিল হয়ে ওঠে। যখন কেউ ঘরে বসে মোবাইল ফোনে স্লট গেম বা লাইভ ক্যাসিনো খেলে, তখন হারানোর প্রভাব তাৎক্ষণিক এবং নিঃসঙ্গ হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা সাধারণত রাত ১০টা থেকে ভোর ২টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্ট্রেস অনুভব করেন। এই সময়টি পারিবারিক সহায়তা ব্যবস্থা সবচেয়ে দুর্বল থাকে এবং নেতিবাচক আবেগ নিয়ে একা থাকার ঝুঁকি সর্বোচ্চ হয়। ঢাকার একটি কাউন্সেলিং সেন্টারের তথ্য অনুসারে, যারা শুধুমাত্র লাইভ ক্যাসিনো খেলেন তাদের তুলনায় যারা অনলাইন স্লট গেম খেলেন তাদের মধ্যে ‘ইমপালস কন্ট্রোল ডিসঅর্ডার’ বিকাশের হার ৪০% বেশি, কারণ স্লট গেমের দ্রুত গতি এবং বারবার ‘প্রায় জিততে পারা’ অবস্থা মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে更多的 ক্ষতি করে।

সামাজিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জুয়াকে সামাজিকভাবে নিন্দনীয় হিসেবে দেখা হয়, যা সমস্যাটিকে আরও গভীর করে। স্ট্রেসে আক্রান্ত ব্যক্তি এটি লুকানোর চেষ্টা করেন, সহায়তা চান না, এবং এটি একটি দুষ্টু চক্রের সৃষ্টি করে। মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের মতে, একজন জুয়াড়ি যখন তার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন না, তখন স্ট্রেস শারীরিক লক্ষণ যেমন পেটের সমস্যা, মাথাব্যথা এবং অনিদ্রায় রূপ নেয়। একটি উদাহরণ হলো, রাজশাহীর একজন ৩২ বছর বয়সী শিক্ষক, যিনি অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা হারানোর পর এমন সামাজিক উদ্বেগে ভুগতে শুরু করেন যে তিনি ক্লাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

এই স্ট্রেস মোকাবিলায় বাংলাদেশের সম্পদ সীমিত। সরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ কম, এবং জুয়ার আসক্তি বিশেষভাবে চিকিৎসা করার জন্য বিশেষায়িত কেন্দ্রের সংখ্যা হাতে গোনা। তবে কিছু অ-লাভজনক সংস্থা হেল্পলাইন চালু করেছে। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং খোলামেলা আলোচনা এই সমস্যা মোকাবিলার প্রথম ধাপ। পরিবারের সদস্যদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ যে তারা প্রিয়জনের আচরণে পরিবর্তন ( যেমন: ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন, টাকা ধার করা, সামাজিক gathering এ অংশ না নেওয়া) লক্ষ্য করলে সহানুভূতির সাথে এগিয়ে আসেন এবং পেশাদার সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।

চলতি বছরে বাংলাদেশ মনস্তাত্ত্বিক সমিতির একটি প্রস্তাবনা হচ্ছে, স্কুল এবং কলেজ পর্যায়ে আর্থিক সাক্ষরতা এবং জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা। তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করাই দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা কমাতে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে। একই সাথে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলির দায়িত্বশীল জুয়ার অনুশীলন, যেমন ডিপোজিট সীমা নির্ধারণ, রিয়েল-টাইম স্পেন্ডিং alerts এবং self-exclusion টুলস প্রদান, একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে ব্যবহারকারীদের স্ট্রেস ও আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top
Scroll to Top